স্বচ্ছতা

গণনা পদ্ধতি

বাংলা পঞ্জিকা-এর প্রতিটি সংখ্যা কোথা থেকে আসছে তা এখানে পুরোপুরি বলা হলো। কোনো তথ্য যদি বিশ্বাসযোগ্য মনে না হয়, তাহলে প্রথমে এই পাতাটি দেখুন — এখানে প্রতিটি সূত্র, প্রতিটি ধরণওয়ালা নিয়ম এবং প্রতিটি সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা আছে।

ভিত্তি: প্রকৃত অন্তর্মণ্ডলীয় হিসাব

সবকিছুর প্রথম ভিত্তি হলো চাঁদ ও সূর্যের প্রকৃত দৈর্ঘিক অবস্থান। এই মানগুলো astronomy-engine লাইব্রেরির মাধ্যমে নেওয়া হয়, যা VSOP87 (সূর্য) ও ELP (চন্দ্র) ধর্মের সংক্ষিপ্ত রূপের উপর ভিত্তি করে গ্রহের অবস্থান হিসাব করে। এটি কোনো সাধারণ তালিকা নয় — প্রতিটি তারিখের জন্য হিসাব আবার করা হয়।

তিথি

তিথি নির্ণয় হয় চাঁদ ও সূর্যের প্রকৃত দূরত্ব থেকে। এই দূরত্বকে ১২° ভাগ করা হয়; ১ ভাগ = ১ তিথি। এক চন্দ্র-মাসে ৩০টি তিথি হয় — ১৫টি শুক্ল পক্ষে, ১৫টি কৃষ্ণ পক্ষে।

পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের প্রায় সব মুদ্রিত পঞ্জিকা প্রকৃত (নির্ণয়) তিথি ব্যবহার করে; কিছু পঞ্জিকা গায়িতিক (সমতল) তিথি ব্যবহার করে, ফলে কিছু তিথিতে কয়েক মিনিটের ফারাক পড়ে। এই সাইটে প্রকৃত তিথি ব্যবহার করা হয়েছে।

নক্ষত্র

নক্ষত্র নির্ণয়ের জন্য চাঁদের নীরেখাষ্ঠ (sidereal) অবস্থান লাগে — অর্থাৎ বিষুব থেকে মাপা অবস্থান থেকে অয়নংশ বাদ দিয়ে নেওয়া অবস্থান। এখানে লহরী (চিত্রপক্ষ) অয়নংশ ব্যবহার করা হয়েছে, যা J2000.0 বিন্দুতে ২৩.৮৫৩০৬° এবং প্রতি শতকালে ৫০.২৯″ বৃদ্ধি পায়। ২৭টি নক্ষত্র প্রতিটি ১৩°২০′, আর প্রতিটি নক্ষত্রকে আরও চারটি পাদে ভাগ করা হয়, প্রতিটি ৩°২০′।

বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি ক্যালেন্ডারের নামকরণ কিছুটা ভিন্ন (যেমন “মঘা”, “বৃহস্পতি”), তাই লহরির নামের সঙ্গে বাংলাদেশি নাম পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে।

যোগ

যোগ হলো সূর্য ও চন্দ্রের নীরেখাষ্ঠ অবস্থানের যোগ, ১৩°২০′ ভাগ করে। এভাবে ২৭টি যোগ পাওয়া যায় (অশ্বিনী যোগ থেকে রেবতী যোগ)। নীরেখাষ্ঠ ব্যবহারের কারণে প্রতিটি যোগের প্রায় ২১ ঘণ্টা স্থায়িত্ব হয়, তাই এক দিনে সাধারণত একটিই যোগ থাকে।

করণ

করণ হলো তিথির অর্ধেক। ১ তিথি = ৬° বিস্তৃত, তাই ১ তিথিতে ২টি করণ ধরে ১ চন্দ্র-মাসে ৬০টি করণ। প্রথম সাতটি করণ (বাম, বালব, কৌল, তৈতিল, গর, ভঙ্গল, বধি) একটি করে চলতে থাকে; শেষ তিনটি করণ (শূন্য, শূক্ল, ইন্দ্র) শুধু মাসের শেষ তিথিতে পড়ে।

সংক্রান্তি ও বাংলা সৌর মাস

সংক্রান্তি হলো সূর্যের নীরেখাষ্ঠ অবস্থান যখন ৩০°-এর একটি পূর্ণসংখ্যা বিন্দুতে পৌঁছায়। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্জিকায় বৈশাখ মাস শুরু হয় মেষ সংক্রান্তির পরদিন থেকে — এই একটি নিয়মেই মাসের দৈর্ঘ্য ২৯ থেকে ৩২ দিন পর্যন্ত বদলায় এবং একই তারিখে দুই মাস পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বাংলাদেশের পঞ্জিকা সৌর সংক্রান্তির উপর নয়, একটি নির্দিষ্ট সূত্রের উপর দাঁড়ানো — পহেলা বৈশাখ সবসময় ১৪ এপ্রিল, এবং মাসের দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট (৩১, ৩১, ৩১, ৩১, ৩১, ৩১, ৩০, ৩০, ৩০, ৩০, ২৯/৩০, ৩০)।

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত

সূর্যের উদয় ও অস্তের সময় নির্ণয় করা হয় অন্তর্মণ্ডলীয় সূর্যের প্রকৃত কেন্দ্রীভূত অবস্থান ও বিক্ষিপ্ততা (refraction) ও প্যারালাক্স বিবেচনা করে সরাসরি হিসাব করা হয়, পঞ্জিকার মার্জিত সূত্রে নয়। এই কারণে উদয়-অস্তের সময় প্রায় এক মিনিটের মধ্যে মেলে।

উৎসবের তারিখ নির্ধারণের নিয়ম

কোনো তারিখ একটি হাতে-লেখা তালিকায় নয়; তার সঙ্গে একটি নিয়ম লেখা আছে। উদাহরণ:

  • দীপাবলি — কার্তিক কৃষ্ণ অমাবস্যা।
  • হোলি — ফাল্গুন শুক্ল পূর্ণিমা।
  • দুর্গাপূজা — আশ্বিন শুক্ল সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত।
  • পহেলা বৈশাখ — মেষ সংক্রান্তির পরদিন।

নিয়মটি প্রয়োগ করার সময় একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন লাগে: তিথির যে দিনটি ধরা হবে সেটি কোন দিন? উত্তর লেগে যায়।

  • সূর্যোদয়ের নিয়ম — সূর্যোদয়ের সময় যে তিথি চলছে সেই দিন (পূর্ণিমা ও সাধারণ তিথি-জনিত অনুষ্ঠানের জন্য)।
  • সংখ্যাগরিষ্ঠের নিয়ম — যে দিনে তিথির বেশি অংশ পড়ে সেই দিন। ২০২৬ সালে কার্তিক অমাবস্যা ৮ নভেম্বর সকাল ১১:২৮ থেকে ৯ নভেম্বর দুপুর ১২:৩১ পর্যন্ত, তাই দীপাবলি ৮ নভেম্বরেই পড়ে, যদিও নবচন্দ্র ৯ নভেম্বরে।
  • শুরুর নিয়ম — যে দিনে তিথি শুরু হয় সেই দিন (মহাশিবরাত্রি)।

ক্ষয় তিথি

কখনো কখনো চাঁদ এক দিনে ১২°-এর বেশি অগ্রসর হয়ে এমন একটি তিথি পুরোপুরি বিলুপ্ত করে দেয়। একে ক্ষয় তিথি বলে। ২০৩১ সালে কার্তিক কৃষ্ণ ত্রয়োদশী এভাবেই পড়েনি — সেই বছর একাদশী দুদিন ধরে চলেছিল এবং ত্রয়োদশী একদমই পড়েনি। মুদ্রিত পঞ্জিকাগুলো এই অবস্থায় আগের তিথির দিনকেই উৎসবের দিন ধরে, এবং পাতায় “ক্ষয়” কথাটি লেখে। এই সাইটেও একই নিয়ম অনুসরণ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট পাতায় ক্ষয় তিথি চিহ্না দেখানো হয়।

শব্দ ও নাম

অমান্ত (নবচন্দ্র থেকে নবচন্দ্র) ও পূর্ণিমান্ত (পূর্ণিমা থেকে পূর্ণিমা) — দুই রীতিতেই চন্দ্র-মাস গোনা হয়। যে মাসে কোনো সংক্রান্তি পড়ে না, সেই মাসকে মাল বা অধিক মাস বলা হয় এবং আগের মাসের নামটিই পুনরাবৃত্ত হয়। এই নিয়মটিই নিশ্চিত করে যে দুর্গাপূজা ২০২৬ সালে অক্টোবরে, নভেম্বরে নয়।

কেন সব মুদ্রিত পঞ্জিকা এক তারিখ বলে না

পঞ্জিকাগুলোর মধ্যে তিনটি প্রধান কারণে পার্থক্য থাকে: অয়নংশের মান, কোন দিনের নিয়ম প্রয়োগ করা হচ্ছে, এবং স্থানীয় রীতি। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও অন্যান্য রাজ্যের মুদ্রিত পঞ্জিকা এই তিনটি বিষয়ে আলাদা। তাই একটি নির্দিষ্ট পঞ্জিকার সঙ্গে হিসাব মিলিয়ে তারিখ দেখা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।

যাচাই ও সংশোধন

যেখানে হিসাব করা তারিখ স্থানীয় মুদ্রিত পঞ্জিকার সঙ্গে মেলেনি, সেখানে সেই যাচাইকৃত তারিখটি আলাদা করে সংরক্ষিত করা হয় এবং পাতায় “যাচাইকৃত” চিহ্না দেখানো হয়। পাতাটির কোথাও ভুল মনে হলে যোগাযোগ করুন; যাচাই করে ঠিক করা হবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ: 2026 সাল।